নিজস্ব প্রতিবেদক
জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জুয়া ও মাদকবিরোধী একের পর এক অভিযান চলমান থাকলেও, কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি ছাড়াই রাজধানীর মতিঝিলে ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্রীড়াচক্র ও হোটেল পূর্বাণীতে রমরমা রামি বোর্ড গেম, কাটাকাটি ও ফ্ল্যাশ জুয়া চলছে প্রতিদিন বিকেল থেকে ভোর পর্যন্ত। আর এই তিনটি স্পটেই জুয়া পরিচালনা করছে মতিঝিলের কুখ্যাত জুয়া ব্যাবসায়ী আনোয়ার ওরফে বরিশাইল্যা আনোয়ার।
মতিঝিলের ক্লাবপাড়া ঘুরে স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, গেলো ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুরো মতিঝিল ক্লাব পাড়ায় সব ধরনের জুয়া খেলা মাস তিনেক বন্ধ থাকলেও, মে-জুন মাস থেকেই একটু একটু করে আবার জুয়াড়ীদের ভিড় জমতে শুরু করে। এরই মধ্যে বিভিন্ন ক্লাবের কমিটিও পুনর্গঠিত হয়। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খাইরুল কবীর খোকনকে সভাপতি এবং বিএনপির সহ ক্রীড়া সম্পাদক আরিফুল হক প্রিন্সকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠন করা হয় ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালনা কমিটি। অপরদিকে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের কমিটি পুনর্গঠিত হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরপরই, বিএনপি নেতা ইসরাকক হোসেনকে আহ্বায়ক করে তখনই গঠন করা হয় ক্লাবের নতুন কমিটি, পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে নজরুল ইসলাম এবং গভর্নর বডির চেয়ারম্যান হিসেবে আজম নাসিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তখনই।
ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই মতিঝিলের কুখ্যাত জুয়া ব্যবসায়ী আনোয়ারকে দায়িত্ব দেয়া হয় ক্লাবটির রামি বোর্ড বা গেম বোর্ড পরিচালনার। আর চতুর আনোয়ার সুযোগ বুঝে সেখানে একই সঙ্গে শুরু করে নিষিদ্ধ কাটাকাটি ও ফ্ল্যাশ জুয়া খেলাও। ওই সময়ই ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা কাটাকাটি ও ফ্ল্যাশ জুয়ার আসরও বসে যায় এই আনোয়ারের নেতৃত্বে। আর তুলনামূলক বিত্তবান খেলোয়াড়দের জন্য আনোয়ার বেছে নেয় হোটেল পূর্বাণীর অষ্টম তলায় বিলাসবহুল একটি কক্ষ, গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে হোটেল পূর্বাণীর ওই কক্ষে নিরাপদে রমরমা জুয়া বাণিজ্য চালাচ্ছে আনোয়ার।
মতিঝিলের ক্লাবপাড়া ঘুরে বিভিন্ন ক্লাবের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনোয়ার এখন মতিঝিলের একচেটিয়া জুয়া ব্যবসায়ী। মতিঝিলের অন্য কোন ক্লাবে কিংবা স্পটে কোনো ধরনের জুয়া খেলা হতেও দেয় না সে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও বিএনপি নেতাদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আনোয়ার একাই বনে গেছে মতিঝিলের একচ্ছত্র জুয়া-সম্রাট।
ক্লাবপাড়ায় আনোয়ারের এই রমরমা জুয়া বাণিজ্য নিয়ে কথা বলতে চাইলে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সভাপতি খায়রুল কবির খোকন ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুল হক প্রিন্সের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। আর ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দায়িত্বে থাকা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা ইরশাদ হোসেনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পাশাপাশি ক্লাব দুটোতে গিয়ে এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে চাইলে প্রধান ফটকের ভেতরেই ঢুকতে দেননি ক্লাবের কর্মচারীরা।
অপরদিকে, হোটেল পূর্বাণীতে আনোয়ারের বিলাসবহুল কক্ষ ভাড়া নিয়ে কাটাকাটি ও ফ্ল্যাশ জুয়া পরিচালনা বিষয়ে কথা বলতে চাইলে হোটেলটির হট লাইন নাম্বারে বারবার যোগাযোগ করেও ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। যতবারই যোগাযোগ করা করা হয়েছে, প্রতিবারই সুকৌশলে ম্যানেজার ফোন রিসিভ করা থেকে বিরত থেকেছেন। আর তার মোবাইল নাম্বার চেয়েও পাওয়া যায়নি ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মীর কাছ থেকে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল থানা এলাকার ভেতর একাধারে দুটো ক্লাব ও একটি আবাসিক হোটেলে আনোয়ারের এই জমজমাট জুয়া বাণিজ্য নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা কী -জানতে চাইলে মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, “ক্লাবগুলোর নিজস্ব কমিটি ও পরিচালনা পর্ষদ আছে, ক্লাবের ভেতরে কি হয় সেই দায় দায়িত্ব তাদের। আর আবাসিক হোটেল পূর্বাণীর ভেতরে এ ধরনের কোনো জুয়া খেলা চলে বলে জানা নেই, খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
Leave a Reply