জেএন ২৪ নিউজ ডেস্ক: আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা। চলছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির নেতাদের পাল্টাপাল্টি নানা বক্তব্য-বিবৃতিও। সরকার পতনের একদফা দাবিতে বিএনপিহ সমমনা জোটগুলো আন্দোলনের চূড়ান্ত ছক তৈরিতে ব্যস্ত। এমন সময়ে পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার হচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ফলে সরকার পতনের আন্দোলনে থাকা দলটিতে নতুন করে গ্রেপ্তার আতঙ্ক শুরু হয়েছে।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, দলের সক্রিয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ‘টার্গেট’ করে করে পুরানো মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি নেতাদের কারারুদ্ধ করতে চায় সরকার। বিচার কাজে হঠাৎ গতি পাওয়া তারই প্রতিফলন। এ জন্য তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ভর করছে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কত মামলা:
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত বিএনপির বিরুদ্ধে করা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ৪৯ লাখ ৪১ হাজার ৭২২। আর অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। মোট মামলার মধ্যে দুই হাজার ৮৩০টির বেশি হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। এর মধ্যে কয়েকশ গায়েবি মামলাও রয়েছে।
বিএনপির দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ওয়ান-ইলেভেনের সরকার থেকে শুরু করে ২০১৩-১৫ সালে করা মামলার কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কিছু মামলা শেষ প্রান্তে। রাজনৈতিক এসব মামলায় বিএনপি মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য, মধ্যমসারির ও তরুণ নেতারা আসামি।
বিএনপি সূত্র জানায়, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির সিনিয়রদের মামলার কার্যক্রম দ্রুতগতিতে নিষ্পত্তি হতে চলছে। বিশেষ করে ২০১৩ এবং ১৪ সালের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করার জন্য দিনে ১০ থেকে ১৫ জন সাক্ষী হাজির করে মামলাগুলো রায়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা এক মামলায় গত ২ আগস্ট বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা মামলায় সম্প্রতি বিচারিক আদালতে বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ৯ বছরের সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। পৃথক আরেকটি মামলায় দলটির আরেক নেতা আমানউল্লাহ আমানের ১৩ বছরের সাজা বহাল রাখা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।
গত রবিবার ছাত্রদলের সাবেক কয়েকজন নেতাসহ ১০ জনকে কারাদণ্ড দেয় আদালত। ২০১৫ সালের এক মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান, কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আহসান হাবিব লিংকনসহ ১৫ নেতার চার বছর কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘সরকার নির্বাচনি মাঠ খালি রাখতেই এলাকায় জনপ্রিয় নেতাদের সাজানো মামলার কারাদণ্ড দিয়ে জেলে ঢোকাচ্ছে। এসব রায় সরকারের ফরমায়েশি।’
গত রবিবার ছাত্রদলের সাবেক কয়েকজন নেতাসহ ১০ জনকে কারাদণ্ড দেয় আদালত। আর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে আটক করা হয় দলের প্রচার সম্পাদক শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীকে। হঠাৎ এ সাজা ও গ্রেপ্তারকে হালকাভাবে নিচ্ছে না বিএনপি।
বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলের নেতাদের আটক করা, সাজা দেওয়া স্বৈরাচারী শাসকদের পুরনো প্র্যাকটিস। বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, সাজা, নির্যাতন বাড়িয়ে দিয়ে সরকার দেশকে সাংঘর্ষিক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে।’
শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতাদের যারা আসামি:
বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৩৭টি। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৯৩টি। আর সর্বোচ্চ ৪৭৮টি মামলা হয়েছে দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে।
এছাড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফের বিরুদ্ধে সাতটি, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে চারটি, মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৪৮টি, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ৩৬টি, নজরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে ছয়টি, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ছয়টি, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বিরুদ্ধে ৯টি, সেলিমা রহমানের বিরুদ্ধে চারটি ও সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে।
যুবদল সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বিরুদ্ধে ৩১৩টি, যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরবের নামে ৩০৫টি, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বিরুদ্ধে ২৫৬টি, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর বিরুদ্ধে ২০৪টি, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বিরুদ্ধে ১৮০টি, নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম রবির বিরুদ্ধে ১৮৪টি, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসানের বিরুদ্ধে ১৪৭টি, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমানের বিরুদ্ধে ১০৬টি, নির্বাহী কমিটির সদস্য আকরামুল হাসানের বিরুদ্ধে ১০৩টি মামলা রয়েছে।
যা বললেন বিএনপি নেতারা:
এ বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘হঠাৎ করে সরকার বিরোধী দলের ওপর মারমুখী হয়ে গেছে। বিএনপি শান্তিপূর্ণ ও উদার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। গত ১ বছর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা রাজপথে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আছি। বিপরীতে সরকার বিএনপিকে শুধু উস্কানিই দিচ্ছে না, বরং নতুন করে মিথ্যা, আজগুবি, বানোয়াট, কাল্পনিক এবং গায়েবী মামলা দিয়ে বিএনপিকে দমন-পীড়নে নেমেছে।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ২৫৬টি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে দমন-পীড়ন চালায় এদেশেও একই কায়দায় দমন-পীড়ন চলছে। আওয়ামী লীগ মুখে শান্তির কথা বললেও তাদের কর্মকাণ্ড অশান্তির এবং হিংসা পরায়ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে এবার এগুলো করে লাভ হবে না। আর কত জেলে নেবে? তারপরও তো বিএনপির দিকে স্রোত ঠেকাতে পারছে না। এই স্রোত একসময় তাদের (সরকার) সিংহাসনের ওপর আছড়ে পড়বে।’
বিএনপি নেতাদের মধ্যে সর্বাধিক ৪৭৮টি মামলার আসামী সাবেক ছাত্রনেতা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল।
তিনি বলেন, ‘এসব মামলা, গ্রেপ্তার ও সাজা দেওয়ার মূল লক্ষ্য হচ্ছে আমরা যাতে আন্দোলনের মাঠে না থেকে আদালতের বারান্দাই ব্যস্ত থাকি। আমরা যাতে আন্দোলন এবং নির্বাচন কিছুই করতে না পারি সেজন্য মাঠ ফাঁকা করছে সরকার। তবে, যত জেল-জুলুম অত্যাচার করুক না কেন এ সরকারে পতন হবেই হবে।’
এবিষয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস বলেন, এগুলো হচ্ছে জুলুম নির্যাতন করে করে ক্ষমতায় থাকার কৌশল। জোর করে ক্ষমতায় থাকার কৌশল। দেশে ন্যায়বিচার কেড়ে নিয়ে বাকস্বাধীনতা হরন করে সামাজিক অস্থিরতা ও দেশকে সরকার নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
Leave a Reply