ইরানের দেওয়া শর্ত একেবারেই অগ্রহণযোগ্য: ডোনাল্ড ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক হাইলাইটস

অনলাইন ডেস্ক: মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে ইরানের দেওয়া শর্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গতকাল রোববার তিনি শর্তগুলোকে ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন।

যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে আলোচনা আবার শুরু করার আশায় কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র সংক্ষিপ্ত একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, রোববার ইরান তার জবাব দেয়। এতে বিশেষভাবে লেবাননসহ সব এলাকায় যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা হয়। পাশাপাশি ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয় আর হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানি সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়, জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম।

বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইরানের পাল্টা প্রস্তাবে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া, ফের আক্রমণ করা হবে না এমন নিশ্চয়তা, তেহরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন বাধা অপসারণের আহ্বান জানানো হয়।

রয়টার্স জানায়, এই প্রস্তাব পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেন, “আমি এটা পছন্দ করি না – সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”

তবে কী কারণে তিনি এটি ‘পছন্দ করছেন না’ তা নিয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এই বাদানুবাদ এমন এক সময়ে শুরু হলো যখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত এই সংঘাত শেষ হবে না।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে নেতানিয়াহুর বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করেছিল।

পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও প্রকাশ্যে তেহরান তাদের অনমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রোববার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, আমরা কখনোই শত্রুর কাছে মাথা নত করব না। সংলাপ বা আলোচনার কথা বলার অর্থ এই নয় যে আমরা আত্মসমর্পণ করছি বা পিছু হটছি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মার্কিন প্রস্তাবের যে উত্তর তেহরান পাঠিয়েছে, তাতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েল এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া, তেহরানের পক্ষ থেকে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।

তেহরানের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো না হলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে যে মার্কিন প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের একটি স্থায়ী সমাধান এবং ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করা।

বর্তমান এই অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। সোমবার লেনদেনের শুরুতেই তেলের দাম অনেকটা বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ০১ ডলারে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালিতে কোনো ‘হস্তক্ষেপ’ নয়

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরান ওয়াশিংটনের কাছে নিজস্ব কিছু দাবি তুলে ধরেছে। তেহরান প্রস্তাব করেছে যে, তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশের ঘনমাত্রা ফেলবে এবং বাকি অংশ কোনো তৃতীয় দেশে স্থানান্তরিত করা হবে।

পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো এই জবাবে ইরান একটি নিশ্চয়তা চেয়েছে—যদি আলোচনা ব্যর্থ হয় বা ওয়াশিংটন পরে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, তবে স্থানান্তরিত ইউরেনিয়াম যেন তাদের ফেরত দেওয়া হয়।

তবে ট্রাম্প ইরানের এই প্রতিক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করার সময় এ ধরনের কোনো খুঁটিনাটি বিষয়ের উল্লেখ করেননি।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছিল, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয় এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।

এরপর থেকে ইরান এই প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলো থেকে টোল আদায়ের একটি নিজস্ব পদ্ধতি চালু করেছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, তেহরান আন্তর্জাতিক এই নৌপথ এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও অন্যান্য জরুরি পণ্য পরিবহনের রুট নিয়ন্ত্রণ করবে—এটি ‘অগ্রহণযোগ্য’।

অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ সৃষ্টি করেছে এবং মাঝেমধ্যে সেখানে আসা-যাওয়া করা জাহাজগুলোকে অকেজো দিচ্ছে বা পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করছে।

একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর পর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। এরইমধ্যে দেশ দুটি ওই অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বাণিজ্য প্রবাহ স্বাভাবিক করার সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে মঙ্গলবার ব্রিটেন ও ফ্রান্স ৪০টিরও বেশি দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের নিয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করবে।

তবে ইরান গতকালই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ব্রিটেন ও ফ্রান্স যদি এই প্রণালিতে তাদের জাহাজ মোতায়েন করে, তবে তারা ‘তীব্র ও তাৎক্ষণিক জবাবের’ সম্মুখীন হবে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিভাবাদি এক্সে লিখেছেন, শুধুমাত্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানই এই প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এবং এ বিষয়ে কোনো দেশের হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না।

এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, হরমুজে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা তাদের কখনোই ছিল না। বরং তারা ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নিরাপত্তা অভিযানের কথা চিন্তা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *