জঙ্গিবাদে জড়িয়ে হিজরত সামরিক ট্রেনিং না করলে তরুণদের বেত্রাঘাত

হাইলাইটস

জেএন ২৪ নিউজ ডেস্ক: জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে কথিত হিজরতে বের হওয়া চার তরুণ স্বেচ্ছায় র‌্যাব কার্যালয়ে আসার পর চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার পর নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে দুইবার সেখান থেকে পালিয়ে আসার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু ধরা পরার পর বেত্রাঘাতসহ বিভিন্ন শাস্তি দেয়া হয়।

জানা গেছে, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আবু বক্কর ওরফে রিয়াসাদ রাইয়ান নারায়ণগঞ্জের একটি বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই ২০২১ সালে শিক্ষক আল আমিনের মাধ্যমে উগ্রবাদে অনুপ্রাণিত হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তরুণ ১২ জনের দলের সঙ্গে তথাকথিত হিজরত করে পাহাড়ে যান। সেখানে যাওয়ার পর নিজের ভুল বুঝতে পারেন। ফেরার চেষ্টা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করতে দেয়া হয়নি তাদের।

পালাতে গিয়ে দু’বার ধরা পড়ে চরম নির্যাতনের শিকার হয় রাইয়ান। সর্বশেষ গত মার্চ মাসের প্রথম দিকে রাইয়ানসহ বেশ ক’জন পালাতে সক্ষম হন।

মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) রাতে তারা র‌্যাব-১১ ব্যাটালিয়ন কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে আবু বক্করসহ চার তরুণ আত্মসমর্পণ করেন। তারা নিজেদের পরিচয় ও কথিত হিজরতের পর নিজেদের ভুল বোঝার তথ্য দিলে র‌্যাব তাদের আটক করে। চারজন হলেন, নারায়ণগঞ্জ বন্দরের আবু বক্কর ওরফে রিয়াসাদ রাইয়ান, সিলেট ওসমানী নগরের মো. হাসান সাইদ ও শেখ আহমেদ মামুন এবং মাদারীপুরের মো. ইয়াছিন।

বুধবার (৯ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, নতুন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’ এর সহায়তায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। ২০২১ সালে ভুল একটা পথকে সঠিক মনে করে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন কেবিন ক্রু মা আম্বিয়া সুলতানা ওরফে এমিলি। তিনি নিজেই তার একমাত্র ছেলেকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে প্রশিক্ষণের জন্য পাহাড়ে পাঠিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি র‌্যাবের ডি-র‌্যাডিকালাইজেশন এর মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে অনুতপ্ত হয়ে ছেলেকে ফিরে পেতে গত ৯ নভেম্বর র‌্যাবের সহায়তা কামনাসহ গণমাধ্যমের সামনে হাজির হয়ে তার সন্তান আবু বক্কর রাইয়ানসহ অন্যান্য তরুণদেরকে ফিরে আসার আকুতি জানান।

কমান্ডার মঈন বলেন, পাহাড়ে যাওয়ার পর বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’ এর সহযোগিতায় সংগঠনটির সশস্ত্র প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কার্যক্রম ও চিন্তাভাবনা দেখে তাদের ভুল ভাঙ্গে। আরও বেশ কিছু সদস্যসহ এই চার তরুণ ফিরতে চাইলেও ফিরতে দেয়নি জামায়াতুল আনসারের সদস্যরা। বরং তাদেরকে বন্দি রেখে নির্মম নির্যাতন করা হয়।

পালাতে গিয়ে দুবার ধরা পড়ে নির্যাতনের শিকার হন চার তরুণ। পাহাড়ে নিয়েই তাদের জোরপূর্বক রশদ পরিবহন, রান্নাবান্না, প্রশিক্ষণের গর্ত করা, ঘর বানানোসহ বিভিন্ন ধরনের কাজে বাধ্য করা হয়। ২০২২ সালের জুন মাসে সিপ্পি পাহাড় থেকে পালিয়ে রনি পাড়া এসে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে যাওয়ার রাস্তা খোঁজার সময় কেএনএফ সদস্যদের নিকট ধরা পড়েন চার তরুণ। জঙ্গি ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের বন্দি রেখে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। তারা আবারও পালানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।’

পাহাড়ে র‌্যাবের অভিযানের মধ্যে পালানোর সুযোগ মেলে

র‌্যাবের অভিযান শুরু হলে তারা পালানোর পথ খুঁজতে থাকে। সুযোগ বুঝে তারা অন্য সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গত মার্চে পালিয়ে সমতলে চলে আসেন। তারা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করেন।’

কুকি-চিন ও নতুন জঙ্গি সংগঠনের পরিত্যক্ত একটি ক্যাম্প থেকে দুই জঙ্গি সদস্যের লাশ উদ্ধার সম্পর্কে কমান্ডার মঈন বলেন, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) পাহাড়ে তিনটি ট্রেনিং সেন্টার ছিল। এই তিনটি ক্যাম্পের একটি থেকে হোমিও চিকিৎসক ডাক্তার আহমেদ ও আবু বক্করের গৃহশিক্ষক আল আমিনের লাশ ছিল। আত্মসমর্পণ করা এই চারজন আলাদা ক্যাম্পে থাকায় সরাসরি হত্যার ঘটনা দেখেনি। তবে তারা অন্য সদস্যদের মাধ্যমে জেনেছেন, বিভিন্ন সময়ে কেএনএফ এর সঙ্গে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হতো। আবার নিজেরাও জড়িয়ে যেতেন। এই সকল সংঘর্ষের সময়ে প্রশিক্ষণরত জঙ্গি সদস্যদের সামনে রেখে সংঘর্ষ হত। এমনই এক সংঘর্ষে ডাক্তার আহমেদ মারা যান। আর আল আমিনের মৃত্যুর বিষয়টি সম্পর্কে তারা জেনেছেন, প্রশিক্ষণের সময়ে বিভিন্ন নির্যাতন, না খাইয়ে রাখা, তাদের দিয়ে অমানবিক কাজ করানো হতো। যেমন- প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি করা গর্ত, খাল তাদের দিয়ে কাটানো হতো। আল আমিন প্রশিক্ষণ অবস্থায় মারা যেতে পারে।

স্বেচ্ছায় হাজির হওয়া ৪ তরুনকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে কমান্ডার মঈন বলেন, তারা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করলেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। তাদের ফিরে আসার বিষয়টি আদালত নিশ্চয় সুবিচার করবে। এক্ষেত্রে র‌্যাবের পক্ষ থেকে আইনী সহায়তা দেয়া হবে।

এখনো নিখোঁজ সাত তরুনকে খুঁজছে র‌্যাব

নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসারে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘর ছাড়া ৫৫ তরুনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। এরমধ্যে ৪৮জন আত্মসমর্পনসহ আটক হয়েছে। তবে এখনো নিখোঁজ সাত তরুন। তাদের আইনের আওতায় আনার তৎপরতা চলমান বলে জানান কমান্ডার মঈন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *